দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়। এক্ষেত্রে পুরুষ অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও কমছে নারীদের। এক সময় নারীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা খুব কম থাকলেও ২০০৪ সাল থেকে তা বাড়ছে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবে কোনো টাকা ছাড়াই যাওয়ার সুযোগের পর থেকে নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে এখনও সামাজিক নানা বাধা রয়েছে। গতকাল এক ওয়েবিনারে উপস্থাপিত এক জরিপে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম, গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিড ও দৃষ্টি রিসার্চ সেন্টার যৌথভাবে ‘বাংলাদেশের অভিবাসন ও লিঙ্গ :একটি অনিয়মিত প্রকৃত দৃশ্যপট’ শিরোনামের এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ওয়েবিনারে পাঁচ জেলার ওপর পরিচালিত দৃষ্টি রিসার্চ সেন্টারের জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এ জরিপে অর্থায়ন করেছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন। ইআরএফ সভাপতি শারমিন রিনভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এসএম রাশিদুল ইসলাম।

ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বলেন, ‘একটি নির্যাতনের ঘটনাও আমরা বরদাশত করি না। আর যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশ যে নির্যাতিত হচ্ছেন, তেমন নয়। শুধু নির্যাতন তুলে ধরলে নারী অভিবাসন বাড়ানো যাবে না। বরং সফলতার বিষয়গুলোও সামনে আনতে হবে।’ তিনি বলেন, অন্যান্য দেশ বিবেচনায় বাংলাদেশের নারী অভিবাসন খুব কম। এর অন্যতম কারণ, এখানকার সমাজ বাস্তবতা বিবেচনায় একজন পুরুষ যত সহজে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, একজন নারী তা পারেন না।

র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, অর্থনীতির আকার যত দ্রুত বেড়েছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে তৈরি হয়নি। এখন দেশ থেকে দক্ষ ও শিক্ষিত শ্রমিক রপ্তানির ওপর জোর দিতে হবে।

ওয়েবিনারে জরিপের আলোকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৃষ্টি রিসার্চ সেন্টারের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর তেরেস ব্লঁশে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত বরগুনা, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মানিকগঞ্জ জেলার একটি করে ইউনিয়নের মোট ১২৫টি গ্রামের ৬ হাজার ৮৪৮ খানার ৮ হাজার ৪৩৭ জনের ওপর এ জরিপ করা হয়।

জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরুষদের অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও নারীদের কমছে। অভিবাসীদের প্রায় ১৪ শতাংশ নারী বিনা খরচে বাইরে গেছেন। পুরুষদের বেলায় যা শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। ১০ হাজার টাকায় বিদেশে গেছেন সাড়ে ৪ শতাংশ নারী। এই ক্যাটাগরিতে কোনো পুরুষ নেই। আর ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিদেশে গেছেন ২৬ শতাংশ নারী। যেখানে ১০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচে গেছেন শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ পুরুষ। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরা প্রকৃত খরচের তুলনায় বেশি ব্যয়ে বিদেশে গেছেন। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কুয়েতে। প্রকৃত খরচের তুলনায় দেশটিতে যেতে ৪২১ শতাংশ বেশি ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাহরাইনে যেতে প্রকৃত খরচের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ শতাংশ।

তেরেস ব্লঁশে বলেন, বাংলাদেশ থেকে মোট ৪৪টি দেশে শ্রমিক যান। এর মধ্যে ২২টি দেশে নারীরা যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে ২০০৪ সাল থেকে। ২০১৫ সালে সৌদি সরকারের সঙ্গে এক চুক্তির পর ২০১৭ সালে ব্যাপকভাবে অভিবাসন বেড়েছে। যেসব নারী বিদেশে গেছেন তাদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৮০ শতাংশ আগে গৃহকর্মী ছিলেন। আর ১৬ শতাংশ তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির বলেন, নারীদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় সমাজে নানা নেতিবাচক কথা। এসব বাধা পেরিয়ে যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের বিমানবন্দরে সেবা বাড়াতে হবে।

আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ, আইএলওর প্রতিনিধি ইগোর বচ প্রমুখ।

 

নারীর অভিবাসন ব্যয় কমছে

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.