অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যত পথ পরিক্রমা শিরোনামে অর্থমন্ত্রী জনাব আ হ ম মুস্তফা কামাল, এফসিএ, এমপি আসন্ন ২০২০-২১ সালের বাজেট উপস্থাপন করেছেন। আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, বাজেট বাস্তবায়িত হলে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮.২ শতাংশ। অবশ্য অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫.২ শতাংশ। মোটা দাগে প্রস্তাবিত বাজেটের বৈশিষ্ট গুলো নিম্নরূপঃ

বাজেটের আকার ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এটি প্রায় ৬৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেশি। বাজেটের পরিচালন খরচ (Operating expenditure) ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৪৮ হাজার কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ২ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের অর্থ সংস্থানের জন্য মোট রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আহরণ করবে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি, এনবিআর বহির্ভূত ১৫ হাজার কোটি এবং নন ট্যাক্স রেভিনিউ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি অনুমান করা হয়েছে ১ লক্ষ নব্বই হাজার কোটি টাকা যা হবে জিডিপির ৬ শতাংশ। অন্যান্য বছর বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের কাছাকাছি হিসাবে করা হত। ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহ (ব্যাংক-৮৪,৯৬০ কোটি এবং সঞ্চয়পত্র ২০,০০০ কোটি সহ) ধরা হয়েছে ১১০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তি প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর রাজস্বের প্রাক্কলনে ভ্যাট হতে সর্বাধিক ১ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি, প্রত্যক্ষ কর ১ লক্ষ ৪ হাজার কোটি এবং বাকী ১ লক্ষাধিক কোটি আমদানি-রপ্তানি শুল্কসহ অন্যান্য পরোক্ষ কর থেকে আসবে।

এবারের বাজেটে সর্বাধিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে (৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা) যা মোট বরাদ্দের প্রায় ১৭ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে পূর্বের তুলনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে এবার বরাদ্দ হয়েছে ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭.২ শতাংশ, কৃষি, মৎস ও প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের ৩.৬ শতাংশ। কৃষি খাতে ভর্তুকির পরিমান ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।

এবারের বাজেটে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক নির্ধারণ অর্থাৎ ফিসক্যাল পলিসিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আয়কর সম্পর্কিতঃ
আয়করের ক্ষেত্রে ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতাগণের করমুক্ত আয় সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা এবং মহিলা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী করদাতাগণের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সাথে সর্বনিম্ন করহার ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর প্রদানের বিষয়টি জনপ্রিয় করার জন্য যে সকল করদাতা প্রথমবারের মত অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন তাদেরকে ২ হাজার টাকা কর রেয়াত দেয়া হবে।

ব্যাংক, লিজিং, বীমাসহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফোন কোম্পানীও সিগারেট প্রস্তুতকারি কোম্পানী ব্যতীত পূঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত নয় এরূপ কোম্পানীর করপোরেট কর হার ৩৫ শতাংশ থেকে ২.৫ শতাংশ হ্রাস করে ৩২.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের কর হার পূর্বের ন্যায় ১০ ও ১২ শতাংশ আরও ২ বছরের জন্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। তৈরী পোশাকসহ সকল রপ্তানি পন্যের উৎসে কর ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। মহামারী করোনা ভাইরাসের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চাল, ডাল, আলু, পেয়াজ, রসুন ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত এমএস স্ক্রাপ সরবরাহের উপর উৎসে কর ৫ শতাংশের স্থলে ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ, রসুন ও চিনি আমদানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ এবং পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের উপর উৎসে কর ৫ শতাংশের স্থলে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেসরকারি খাতে অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ গতিশীল করা এবং যাদের হাতে অর্থসম্পদ রয়েছে কিন্তু কোন কারণে আয়কর রিটার্ণে পূর্বে দেখানো হয়নি তাদেরকে সুযোগ দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার উদ্দেশ্যে আয়কর অধ্যাদেশে ২টি ধারা সংযোজন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় Extraordinary times require extraordinary measuresনেয়ার ফলে আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাগণ আয়কর রিটার্ণে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং কিংবা ফ্ল্যাট এর প্রতি বর্গমিটারের উপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার বা বন্ড এর উপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করে আয়কর রিটার্ণে প্রদর্শন করতে পারবেন। পরবর্তীতে আয়কর কর্তৃপক্ষ বা অন্যকোন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন করতে পারবেনা। এছাড়া ৩ বছরের জন্য লকইনসহ কিছু শর্তসাপেক্ষে আগামী অর্থবছরের ভিতর পূঁজিবাজারে বিনিয়োগ করলে ১০ শতাংশ কর প্রদান করে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করতে পারবেন।

আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং রোধের জন্য একটি নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে। এ বিধান অনুযায়ী যে পরিমান অর্থ আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং করে পাচার প্রমানিত হবে তার উপর শতকরা ৫০ শতাংশ হারে করারোপিত হবে। এছাড়া সকল টিআইএন ধারীদের রিটার্ণ দাখিল বাধ্যতামুলক করে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে দেশিয় শিল্পকে প্রনোদনা প্রদান ও প্রতিরক্ষণের জন্য বেশ কিছু কাল যাবৎ প্রায় ৬০টি খাতের উৎপাদনে বিভিন্ন মেয়াদে কর অবকাশ বা হ্রাসকৃত শুল্ককর নির্ধারিত আছে। এবার গাড়ি তৈরীর যন্ত্রাংশ উৎপাদন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার এবং বিমান রক্ষণাবেক্ষণ যন্ত্রাংশ উৎপাদন সহ ৭টি খাতকে কর অবকাশের আওতায় আনা হয়েছে।

কার অথবা জীপ গাড়ি ক্রয় ও ব্যবহারের জন্য বার্ষিক করের পরিমান ইঞ্জিন ক্যাপাসিটির ভিত্তিতে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেমন ১৫০০ সিসি ইঞ্জিন বিশিষ্ট গাড়ির পূর্বের বার্ষিক কর ১৫,০০০/- টাকার স্থলে বর্তমানে ২৫,০০০/- টাকা, ১৫০০ থেকে ২০০০ সিসি ইঞ্জিন বিশিষ্ট কার/জীপ গাড়ির ক্ষেত্রে ৩০,০০০ টাকার স্থলে ৫০,০০০/- টাকা ক্রমান্নয়ে বৃদ্ধি করে ৩৫০০ সিসির অধিক গাড়ির কর ২,০০,০০০/- টাকা করা হয়েছে।

মূল্য সংযোজন কর সম্পর্কিতঃ
মূল্য সংযোজন আইন ২০১২ এর সংশোধন ও সহজীকরণ সহ কতিপয় প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে শিল্পের কাঁচামালের উপর আগাম কর (Advance Vat) ৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ৪ শতাংশে নির্ধারণ এবং ব্যবসায়ীদের রেয়াত গ্রহণের সীমা ২ কর মেয়াদ হতে ৪ কর মেয়াদ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।

অযৌক্তিক মূসক মামলা দায়ের হ্রাস করার জন্য আপীল কমিশনারেট ও ট্রাইব্যুনালে আপীল দায়েরের ক্ষেত্রে দাবীকৃত করের ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষার তেলের উপর প্রচলিত ৫ শতাংশ মূসক অব্যাহতির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সকল প্রকার কৃষি যন্ত্রপাতির উপর থেকে ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। পটেটো ফ্লেক্স তৈরীর উপর মূসক হার ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে মেইজ স্টার্চ উৎপাদনের ক্ষেত্রে মূসক ১৫ শতাংশ হতে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

দেশিয় টেক্সটাইল শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে সকল সিনথেটিক সুতার মূসক হ্রাস করা হয়েছে। কোভিড টেস্ট কীট, পিপিই ও মাস্কের উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া কোভিড-১৯ নিরোধক ঔষধ আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূসক প্রত্যাহার করা হয়েছে। আসবাবপত্র বিপননের ক্ষেত্রে মূসক বৃদ্ধি করে ৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে।

কার ও জীপের ক্ষেত্রে বিআরটিএ কে প্রদত্ত সার্ভিস ফি এর উপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশের স্থলে ১৫ শতাংশ, চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার উপর সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশের স্থলে ৩০ শতাংশ, মোবাইল ফোনের সিম/রীম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে প্রদত্ত সেবার উপর ১০ শতাংশের স্থলে ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও প্রশাধনী সামগ্রীর উপর ৫ শতাংশের স্থলে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সিরামিক সিঙ্ক ও বেসিন উৎপাদনে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপিত হয়েছে। স্বর্ণ আমদানির উপর ১৫ শতাংশ মূসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তামাকজাত পণ্যের আরোপিত সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাবের ১০ লক্ষ টাকার অধিক স্থিতির উপর আবগারি শুল্ক (Excise duty) বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আমদানি-রপ্তানি শুল্ক সম্পর্কিতঃ
আমদানি পর্যায়ে বেশ কিছু দ্রব্যাদির শুল্ক হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়েছে। শুল্ক বৃদ্ধির মধ্যে পেঁয়াজ, শিল্প লবন, পেরেক, স্ক্রু, ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, মধু, ড্রেজার আমদানি, গ্লু, এলুমিনিয়াম এ্যালয় তার, ফেরো ম্যাঙ্গানিজ ও ফেরোসিলিকন, লাইটনিং এরেস্টার, এবং আরো কিছু স্থানীয় শিল্পের তৈরি সামগ্রী আমদানি অন্তর্ভূক্ত।

যে সব দ্রব্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে এদের মধ্যে পৌল্ট্রি খাদ্যের উপকরণ, সমুদ্রে মাছ ধরার উপকরণ, গার্মেন্টস খাতের ট্যাগ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল র্যাক ও কাটিং টেবিল, ডিটারজেন্ট প্রস্তুতের কাঁচামাল, সেনিটারী নেপকিন ও ডায়াপার তৈরির কাঁচামাল ও ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া স্থানীয় দেশীয় শিল্পের প্রতিরক্ষণের জন্য বেশকিছু আমদানি দ্রব্যের উপর শুল্ক হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়েছে।

পর্যালোচনাঃ
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ সালের বাজেটটি প্রণয়ন করা হয়েছে মহামারি করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ সংক্রমনের ফলে সৃষ্ট অর্থণৈতিক সংকট মোকাবেলা, উত্তরণ এবং সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনা, রূপকল্প ২০২১, এসডিজি ২০৩০ বাস্তবায়ন ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ এর লক্ষ্যকে সামনে রেখে যথাক্রমে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে উত্তরণের অনুসঙ্গ হিসেবে, যেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধির (8.2 শতাংশ) লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। কিন্তু করোনা ভাইরাস সংক্রমনের সংকট উত্তরণ আগামী জুলাই-সেপ্টেম্বর কোয়ার্টারে সম্ভব কী-না এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশে এ মহামারির সংক্রমন ও মৃত্যু বেড়েই চলেছে। সাধারণত সংক্রমনের ওয়েভ সর্বোচ্চ মাত্রায় (Peak) পৌছে পরে নিচের দিকে নামে। সেটি কবে শুরু হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। জুন ১৫ পর্যন্ত মোট সংক্রমিত ৯০,৬১৯ জন এবং মোট মৃত্যু ১২০৯ জন। বেসরকারিভাবে আত্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা। করোনা ভাইরাসের সংক্রমন না কমলে বাজেট বাস্তবায়ন দুরূহ হয়ে পড়বে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ‘গ্লোবাল ইকনমিক প্রস্পেকটাস ২০২০’ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দায় পড়বে বিশ্ব। ৭-১০ কোটি মানুষ চরম দরিদ্রতায় পতিত হবে। এ বছর (২০১৯-২০) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৬ শতাংশ হতে পারে। আগামী বছর তা আরো কমে যাবে। ইতোপূর্বে আইএমএফ ভবিষ্যৎবাণী করেছিল যে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ হতে পারে। তবে আমরা আরো কিছুটা আশাবাদী হয়ে বলতে পারি, যেহেতু গত জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ভাল প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেহেতু বছর শেষে (৩০ জুন ২০২০) প্রবৃদ্ধি 4 শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।

আসন্ন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে বরাদ্দের বিবেচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সামাজিক সুরক্ষা খাতে। বয়স্ক, দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ বরাদ্দ ব্যয় হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্য খাত দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ, মহামারী সংক্রমন মোকাবেলার জন্য কীট, পিপিই, মাস্ক, অক্সিজেন এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহের লক্ষ্যে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মধ্যম স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিস্তারে অগ্রগতি ভাল। কিন্তু উচ্চ (Tertiary) স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন- আইসিইউ, ভেন্টিলেশন, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ইত্যাদিতে দেশ এখনো পিছিয়ে আছে। করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব হলে উন্নত স্বাস্থ্য সুরক্ষার দুরবস্থা প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। সে জন্য জরুরী ভিত্তিতে কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে টারশিয়ারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নতকরণ সহ মহামারি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

বৈশ্বিক মন্দাবস্থার উন্নতি না হলে বাংলাদেশের অগ্রগতিও ব্যহত হবে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে সময় লাগবে। বিদেশী বিনিয়োগেও আসতে পারে স্থবিরতা। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগেও কাঙ্খিত বিস্তৃতি ও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যনীয় হবে বলে মনে হয় না। এছাড়া চালু শিল্প কারকানা, সার্ভিস সেক্টর যেমন- হোটেল, রেস্তোরা, এয়ার লাইনস্, পরিবহন, পর্যটন ইত্যাদি কবে আবার সচল হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান হবেনা, বরং অনেক লোক কর্মহীন হয়ে পড়বে। অর্থনীতিতে ভোগ চাহিদা কমে যাবে এবং সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্থ হবে।

উল্লিখিত প্রেক্ষাপটে এনবিআর রাজস্ব আহরণেও আসতে পারে মন্দাভাব ও স্থবিরতা। মহামরারি পরিস্থিতির উন্নতি হলে অর্থনীতি নিজস্ব গতিতে ঘুরে দাঁড়াবে। আমরা কিছুটা আশাবাদী মনোভাব নিয়ে বলতে পারি আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ৪-৫ শতাংশ হতে পারে। তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে এখন পৃথিবীর কোন দেশই চিন্তিত নয়, টিকে থাকাই বড় কথা। এনবিআর রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি যাওয়ারও সম্ভাবনা নেই, বরং ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির সম্ভাবনা।

আয়কর আইনে নিম্নমুখী পরিবর্তনের ফলে প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহ কমে যাবে। বর্তমান করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো এবং করা হার ৫ শতাংশ নামিয়ে আনা ভাল উদ্যোগ, কিন্তু উচ্চহার ৩০ থেকে ২৫ শতাংশে নামানোর ফলে উচ্চ আয়ের করদাতাদের সুবিধা বেশি হয়েছে। ৩০ শতাংশের হারটি বহাল রাখা যৌক্তিক হবে। করপোরেট করহার শুধুমাত্র ননলিস্টেড কোম্পানীর ক্ষেত্রে কমানোর ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানীগুলো হতাশ হয়েছে। এমনিতেই অনেক ননলিস্টেড কোম্পানীর করআয় হিসাবে অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে। 2.5 শতাংশ করপোরেট কর কমানোর ফলে রাজস্বের যে ঘাটতি হবে তা পূরণ করার কোন পথ খোলা রাখা হয়নি।

অপ্রদর্শিত আয় বা ‘কালো টাকা’ বৈধ করার পথটি এবার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হয়েছে। যারা এরূপ অর্থ সম্পদের মালিক তারা যদি এবার এ সুযোগ গ্রহণ না করেন, তবে ‘বোকামী’ হবে। এত অল্প হারে কর প্রদান করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ভবিষ্যতে আসবে কী-না সন্দেহ আছে। ১০ শতাংশ আয়করের সাথে অন্তত ৫ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা উচিৎ। এ আইনটি নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে। শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিন বছরের জন্য ‘লকইন’ করার বিধানটি ওখানে বিনিয়োগ নিরূৎসাহিত করবে।

মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক হারে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে সেগুলো বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বান্ধব বলা যায়। কোভিড-১৯ সংক্রমনে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ও ব্যবসায়ী চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। তবে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সীম/রীম ব্যবহারে যে মূসক বৃ্দ্ধি করা হয়েছে তাতে যৎসামান্য রাজস্ব হয়তো বাড়বে,কিন্তু সরকারের সমালোচনা হচ্ছে তারচেয়ে বেশি। আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাবের স্থিতির উপর এক্সাইজ কর কেটে নেয়াও আরেকটি অজনপ্রিয় পদক্ষেপ। গাড়ি ক্রয় ও ব্যবহারে বার্ষিক করবৃ্দ্ধির চাপ শুধুমাত্র বিত্তবানদের উপরই পড়বেনা বরং মধ্যবিত্ত এবং আমাদের মত অবসর প্রাপ্তদের উপর পড়বে অধিক মাত্রায়। উপরিউল্লিখিত কয়েকটি বিধান পুনর্বিবেচনার দাবী রাখে।

রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার অত্যন্ত জরুরী। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গত নভেম্বর ডিসেম্বরে সরকারের বিবেচনার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে অগ্রগামী করা হয়েছে। করনেট বাড়ানোর প্রয়োজনে এ প্রস্তাব আশু বিবেচনার দাবী রাখে। রাজস্ব আহরণে অটোমেশন তথা সফটওয়্যার ও মেশিনের ব্যবহার সময়ের দাবী। এর ফলে রাজস্ব ফাঁকি ও দুর্নীতি অনেকাংশে দূর হবে।

নতুন কাস্টম আইন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষ দিকে মহান সংসদে উত্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু সময়ের স্বল্পতায় আইনটি পাশ না হওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থসালের প্রথম দিকে এটি পুণরায় জাতীয় সংসদে পেশ করা হলে অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়। ৩০ জুনের মধ্যে এ আইনটি পাশ না হলে আবার তামাদি হয়ে যাবে। নতুন আয়কর আইনটিও আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের শুরুতেই মন্ত্রিসভা ও সংসদে উঠা জরুরী। রাজস্ব সংগ্রহে গতি আনয়নের ক্ষেত্রে এসব সংস্কার সহায়ক হবে।

বড় বাজেটের অর্থায়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু অর্থায়ন বাংলাদেশে কোন সমস্যা নয়। বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে হবে। চালু প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোতে যে যে খাতে সহায়তার ঘোষণা দেয়া হয়েছে সে সকল খাতসমূহের প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য শিল্পমালিক ও বিনিয়োগকারীদের দ্রুত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এখানে দীর্ঘসূত্রীতা ও জটিলতা মোটেই কাম্য নয়।

শেষকথাঃ
করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে সরকারি বেসরকারি সকল পর্যায়ে সর্বাত্ত্বক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, উন্নয়ন সহযোগী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে কার্যকর নেগোশিয়েশনের মাধ্যমে বাজেট সাপোর্ট সংগ্রহ, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পর্যায়েক্রমে খুলে দিয়ে দেশের উৎপাদন সচল করা হলে বাংলাদেশের কষ্ট সহিষ্ণু জনগন আপন শক্তিতে দেশের স্থবির অর্থনীতি সচল করতে সক্ষম হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.