করোনার থাবা থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে আমাদের করণীয় কী হবে? গতানুগতিক বাজেট হবে, নাকি করোনা উত্তরণের বাজেট? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতে সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক এক ভিডিও আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবদ ড. আতিউর রহমান বলেন, জীবন ও জীবিকাকে আলাদা ভাবে দেখার সুযোগ নেই। আগে বাঁচবো, তারপর জীবিকা অন্বেষণ করবো। তাই এবারের বাজেট হতে হবে বেঁচে থাকার বাজেট। টিকে থাকার বাজেট।

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা এই অর্থনীতিবদ বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য ও নগদ সহায়তা এক সাথে দিতে হবে। স্বল্প সময় নয় বরং তিন চার মাসের জন্য এই সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে করোনার অভিঘাতে যারা নতুন করে গরীব হয়েছে, তাদের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। পুরনোরা হয়তো কোন না কোন ভাবে সহায়তা কর্মসূচির সাথে যুক্ত আছে। কিন্তু নতুন দরিদ্রদের ক্ষেত্রে তা নেই। তারা হয়তো জানেও না কোথায় গেলে সহায়তা পাওয়া পাবে।

করোনা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে যে আতঙ্ক কাজ করছে তা দূর করতে হবে। আক্রান্ত সবাইকে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। হাসপাতাল গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিইউ’র ব্যবস্থা করতে হবে। আইসিইউ থাকবে, কিন্তু অক্সিজেন থাকবে না, এমন যেন না হয়। নীচের দিকের লোকদের কথা ভাবতে হবে। তারা যেন এই দুর্যোগে স্বাস্থ্যসেবা পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তাই এ বছরের বাজেট হতে হবে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বাজেট। স্বাস্থ্যখাত খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। বরাদ্দের পরিমাণ মোট দেশজ আয়ের এক শতাংশও হয় না। আসছে অর্থবছরে এই হার ২ শতাংশে নিতে হবে। ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে তা ৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকির ভয় না কাটা পর্যন্ত ব্যবসাবাণিজ্যে আস্থা ফিরে আসবে না। ঝুঁকি কমানোর জন্য ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা বাড়াতে হবে। হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা বাড়াতে হবে। টেকনিশিয়ান তৈরির জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। টেলিমিডিসিনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা বড় একটি মাধ্যম হতে পারে। স্বাস্থ্যবীমাকে গুরুত্ব দিতে আসছে বাজেটে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যবীমার ঘোষণা থাকতে হবে।

স্বাস্থ্যখাতের দক্ষতা বাড়াতে হবে। দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কাজে লাগানো যায় কিনা দেখতে হবে। ভারতে বেসরকারি হাসপাতালে ২০-৩০ শতাংশ শয্যা দরিদ্র রোগীদের জন্য রাখা হয়। এর খরচ বহন করে সরকার। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগে হয়তো মানুষের ভয় কিছুটা কাটবে।
রপ্তানি ও রেমিটেন্স আয় কমে আসায় অর্থনীতিতে চাহিদাজনিত যে মন্দা তৈরি হবে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে, যদি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায়। এতে চাহিদা বাড়বে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কৃষি পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিতের উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই, বিভিন্ন অঞ্চলের নদীর চরে নানা ধরনের প্রচুর সবজি আবাদ হয়েছে। সেগুলো শহরে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ কৃষিতে সরবরাহ ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি পুনরুদ্ধার করতে হবে।

এক্ষেত্রে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরবরাহ খরচ কমিয়ে আনা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে আমের ট্রাক ঢাকায় আসবে। এক্ষেত্রে ঐ ট্রাককে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি টোকেন দেয়া হবে। যেন রাস্তায় কোন ধরনের চাঁদা দিতে না হয়। আবার খালি ট্রাক যখন ফেরত যাবে, তখন তার জন্য তেল খরচের টাকা দেয়া যেতে পারে। যাত্রা পথে টোল ফ্রি করে দেয়া যেতে পারে।
কৃষিখাতকে গতিশীল করতে হবে। কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) অনেকগুলো কৃষক বাজার (ফার্মার্স মার্কেট) চালু করেছে। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে এই ধরনের বাজার প্রতিটি বিভাগ ও জেলা শহরে করা যেতে পারে। সচেতন মানুষের মধ্যে এখন ক্যামিকেল মুক্ত কৃষি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এটা মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে শহরের ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদা অনেক বেড়েছে। তাই কৃষি পণ্য বিপণনে ই-কমার্সকে অধিকহারে যুক্ত করতে হবে। এতে বহু তরুণরে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অন্যদিকে কৃষকও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাবে।
সরকার বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য যে বরাদ্দ রাখে তার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই পেনশনের টাকা। এই অংশটুকু বাদ দিলে এ খাতে অর্থের পরিমাণ খুব বেশি নয়। সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগী চিহ্নিত ও তাদের হাতে অর্থ পৌঁছে দেয়ার জন্য এনজিও, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলো এক সাথে কাজ করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। করোনাকালে মানুষে দোড়গোড়ায় সহায়তা পৌঁছে দিতে, স্থানীয় সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মেয়রদের ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ দেয়া উচিত।

অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের জন্য যে অর্থ রাখা হয়েছে সেটা যেন উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এ খাতের ৬০ ভাগ ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। ২০ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই পুন:অর্থায়ন তহবিলের আওতায় দিলে ভালো হবে। এই সহায়তা করলে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কা থাকবে না।

দুর্যোগে এই দেশের সাহসী মানুষেরা বরাবরই জেগে ওঠে। করোনকালেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, বহু মানুষ দরিদ্রদের সহায়তায় এগিয়ে আসছে। এমন একটি মানবিক সমাজকে কাজে লাগিয়ে আমরা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। আসছে বাজেটে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের প্রবদ্ধির বড় অংশই ভোগ ব্যয় নির্ভর। আর উন্নয়নের ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নের দিকে যেতে হবে। পরিবেশকে সুরক্ষা দিয়ে শিল্পায়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে গ্রিন ফাইন্যান্সিং বা সবুজ অর্থায়নের দিকে যেতে হবে আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.