করোনায় বিপর্যস্ত বিশ^ অর্থনীতি। ক্ষতির মুখে বাংলাদেশও। দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা- কার্যত বন্ধ। কমছে আমদানি-রপ্তানি ও রেমিটেন্স আয়। হ্রাস পাচ্ছে রাজস্ব আহরণ। স্বাস্থ্যখাত বিপর্যস্ত। এমন চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আসছে নতুন অর্থবছরের বাজেট। ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে পারেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এটি কোভিড-১৯ মোকাবেলার বাজেট হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান হাবীব মনসুর। ইআরএফ মিডিয়ার সাথে একান্ত আলাপকালে তিনি বলেন, নতুন বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা ও স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন করা।

করোনা সংক্রমণ রোধ ও স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন
আসছে বাজেটে সবার আগে করোনা সংক্রমণ রোধে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা ও অর্থ বরাদ্দ রাখার কথা বলছেন আহসান মনসুর। তিনি বলেন, যদি সংক্রমণ ঠেকানো না যায় তাহলে অর্থনীতিকে পুরুদ্ধার করা যাবে না। পুরোপুরি সংক্রমণ হয়তো কমবে না, তবে সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে হবে। তার মতে, স্বাস্থ্যখাত প্রচন্ড ভঙ্গুর। সেবা না দিয়েই বহু ডাক্তার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্যখাতের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই করোনা মোকাবেলায় বাধা বলে তার অভিমত। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠনের আহবান জানিয়েছেন তিনি। বাজেটে এই খাতের জন্য যেমন বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়াতে হবে তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়টিতে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে হবে।

নগদ অর্থসহায়তা
করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুত্থানের পাশাপাশি মানুষ যাতে খাদ্য কষ্টে না থাকে সে দিকে বেশি নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট (পিআরআই) এর নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ড. আহসান হাবীব মনসুর। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকা- ব্যাহত হওয়ায় দেশে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ থেকে উত্তরণে সরকার ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তবে এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তার মতে, অন্তত দেড় কোটি পরিবারকে ৩ হাজার টাকা করে ছয় মাস অর্থ সহায়তা দেয়া উচিত। এজন্য সরকারকে ২৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে। নতুন বাজেটেই এই অর্থ বরাদ্দ রাখার আহবান জানিয়েছেন তিনি।

বেকারত্ব দূর করা
করোনা প্রভাবে কত মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে তার কোন সরকারি পরিসংখ্যান না থাকায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন আহসান মনসুর। তার মতে বেসরকারি হিসেবে বেকারের সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এসব বেকারদের জন্য যতদ্রুত সম্ভব কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। অনানুষ্ঠানিকখাতে যারা কাজ করতো তাদের বেশির ভাগই কাজ হারিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এদের জন্য নগদ সহায়তা দিতে হবে। এক্ষেত্রে স্বল্প মূল্যে চাল কিংবা অন্য কোন ধরনের খাদ্য সহায়তার বিরোধিতা করে আহসান মনসুর বলেন, এটা করলে দুর্নীতি আরো বেশি হবে। সহায়তা হাতে পৌঁছাবে না। সরকারের উচিত হবে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে তাদের নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া। এক্ষেত্রে তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি কিংবা দুর্নীতির আশ্রয় যাতে নেয়া না হয় সেদিকে সতর্ক থাকার আহবান তার।

এমএমই খাতকে বেশি সহায়তা
অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন আহসান মনসুর। তবে এই প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ তার। এসব শিল্পকে চালু করতে পারলে আপতত সংকট কিছুটা কাটবে বলে তার আশাবাদ। তবে এই সহায়তার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ঝুঁকি ব্যাংকের ঘাড়ে না চাপানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো প্রণোদনার সহজ শর্তের ঋণের টাকা ফেরত নাও আসতে পারের। সেক্ষেত্রে সরকার যদি ব্যাংকগুলোর পাশে না দাঁড়ায় তাহলে অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে বলে তার আশঙ্কা।

বড় প্রকল্প ও প্রবৃদ্ধি
করোনা বিপর্যয়ের মাঝে নতুন কোন বড় প্রকল্প গ্রহণ না করার অনুরোধ করেছেন অর্থনীতিবিদ আহসান মনসুর। যেসব প্রকল্প চলমান সেগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। সেই সাথে করোনা মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের পরামর্শ তার। এর বাইরে অপ্রয়োজনীয় ছোট ছোট প্রকল্প বাদ দেয়ার কথা বলেছেন আহসান মনসুর। তার মতে, সরকার নতুন বছরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির আশা করলেও করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের বেশি হবে না। তবে করোনা বিপর্যয় ঠেকাতে পারলে হয়তো আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে তার অনুমান।

আমদানি-রপ্তানি
করোনায় অর্থনীতির গতি থমকে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই আমদানি রপ্তানি কম হচ্ছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি না হওয়ার পাশাপাশি সার্বিকভাবে এর আকার আগের তুলনায় কমে যাবে। যা হয়তো সরকারকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে রেমিটেন্স আয় কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে। যা অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর জন্যই বেকারত্ব হ্রাস ও দরিদ্রদের মাঝে নগদ সহায়তা দেয়ার প্রয়োজনীতা দেখা দিয়েছে বলে জানান আহসান মনসুর। তার মতে, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছে গেছে।

সরকারের জন্য স্বস্তি
এত চ্যালেঞ্জের মাঝেও সরকারের জন্য স্বস্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের মূল্য পতন। কম মূল্যে জ¦ালানি তেল পাওয়ায় সরকার অনেক মুনাফা করতে পারবে। এই মুনাফার অর্থ বাজেট ঘাটতি পূরণে কাজে লাগবে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া বাড়তি অর্থ খরচ না হওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি তৈরি করবে না। অতটা টান পড়বে না রিজার্ভের অর্থেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published.