বিশ্ব অথনীতিকে আবারো মহামন্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছে করোনা। কোন কোন অর্থনীতিবিদের ধারণা, ১৯৩০ সালের মত আরো একটি মহামন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব। তবে অর্থনীতিকে টেনে তোলার জন্য দেশে দেশে সরকারগুলো বেশ তৎপর। প্রয়োজনে মানুষের জীবন যাবে, কিন্তু অথনীতি যেন মন্দায় না পড়ে সেজন্য দেশগুলো নানা ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এতে আসলে লাভবান হবে কারা?

এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিস এর আর্থিক ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রধান মোহিত জোশি। তার দীর্ঘ নিবন্ধটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) এর ওয়েবসাইটে প্রকাশি হয় গেল মাসে। নিবন্ধটি ভাষান্তরের পাশাপাশি এর সাথে বাংলাদেশের বাস্তবতাও যুক্ত করা হয়েছে।

জোশি তার নিবন্ধে বলেন, করোনাকালে প্রণোদনার এই অর্থ পাওয়ার যুদ্ধটা হবে ছোট ও বড়দের মধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই সক্ষমতা কম থাকায় ছিটকে পড়বে ছোটরা। সুযোগ বাড়বে বড়দের। অর্থাৎ করোনা পরবর্তী বিশ^ অর্থনীতিতে বড় বড় শিল্পগ্রুপগুলোই টিকে থাকবে। ছোটদের বিদায় নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। এতে বহু মানুষ কর্ম হারাবে। তাদের কথা হয়তো ভাববার সময় পাবে না নিষ্ঠুর বাস্তবতা। কর্মহীন মানুষের মিছিলকে আরো লম্বা করবে আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

করোনা পরবর্তী পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। এই দুই ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের দিকেই ঝুঁকবেন শিল্পপতিরা। করোনা দেখিয়ে দিচ্ছে, মানব শ্রমশক্তি ভাইরাসটির কাছে আসলে কতটা অসহায়। শ্রমিক থাকলেও তার শ্রমকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাই উৎপাদন ও সরবরাহ ধরে রাখতে হলে মানব শ্রম শক্তির বিকল্প ভাবতেই হবে। অবশ্য করোনার আগেই বিশ^ জুড়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা হচ্ছিল। এই বিপ্লবের হাতিয়ার হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকেই ধরা হচ্ছে।

বাংলাদেশের মত শ্রমঘন শিল্পের দেশেও বিভিন্ন কারখানায় স্বল্প পরিসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। করোনা পরবর্তী শিল্পখাতে যে বড় ধরনের রুপান্তর ঘটবে, তাতে এর ব্যবহার বাড়বে বৈ কমবে না। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও ভাববেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এই ধরনের মহামারি আবারো আসতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই শিল্পখাতে এই পরিবর্তন আসতে বাধ্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির চাহিদা বাড়বে করোনা পরবর্তী আগামীর বিশে^। এখাতে তাই ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে উন্নত দেশগুলো।

এর ফলে প্রযুক্তি ও মানব সম্প্রদায় এর মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হবে সে বিষয়ে কী কিছু ভাবছে বিশ^? উৎপাদন ও সরবরাহখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর ফলে মানুষের জায়গা দখল করে নিবে প্রযুক্তি। বিশে^ লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ বেকার হবে। এই দ্বিমুখী সমস্যার সমাধান কী হবে সে বিষয়ে বিশ^ কিছু ভাবছে না বলেই মনে করেন মোহিত জোশি।

বড় ধরনের কোন মহামারি বা যুদ্ধের পর বিশ্বে সব কিছুতেই পরিবর্তন আসে এবং এই পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী ও প্রত্যাশিত। পরিবর্তনকে মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে, এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের সূত্র ধরে সংঘাতের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা যতটা কম হয় সেদিকে নজর দিতে হবে বিশ^ নেতাদের। তারা হয়তো নতুন ধরনের ব্যবসার সম্ভাবনার কথাই আগে ভাববেন। কিন্তু সেই ভাবনার সব কিছুই যেন সংঘাতে বিলীন হয়ে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক নজর দিতে হবে।
করোনা পরবর্তী বিশ^ বাজারে আরো একটি শিল্পের বড় ধরনের বিকাশের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, তাহলো ই-কমার্স। বাজারে না গিয়েই ঘরে বসেই কেনাকাটার এই ভাবনা কারোনার আগেই কিছুটা রপ্ত করেছিল দুনিয়ার মানুষ। করোনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও লকডাউনে এর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে ই-কমার্স এখনো সেই সক্ষমতা কিংবা সেবাগ্রহণকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তবে এটা ঠিক কারোনা কালেই ই-কমার্সের চাহিদা যেহারে বেড়েছে, দুর্যোগ পরবর্তী তাতে খুব একটা ভাটা পড়বে না। তাই ই-কমার্সের পরিসর আরো বাড়াবে এবং তৈরি হবে নতুন ব্যবসার সুযোগ ও কর্মসংস্থান।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয় বলে, করোনা কালে নগদ লেনদেন কমে গেছে। বেড়েছে ক্যাশলেস ট্রানজেকশন বা ডিজিটাল মানির ব্যবহার। ইন্টারনেট কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং বেড়েছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে, এটি না বেড়ে উপায়ও ছিল না। বিশে^র ৩১টি দেশ ডিজিটাল মানি লেনদেনে তাদের নির্ধারিত সীমা উঠিয়ে দিয়েছে। এর মানে যত পারা যায় ডিজিটালি লেনদেন করতে হবে, তাতে ওই সব দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কোন আপত্তি থাকবে না। এই মুহুর্তে নগদ লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করছে সব দেশ।

বাংলাদেশেও তৈরি পোশাক শ্রমিকদের বেতন হাতে হাতে না দিয়ে ডিজিটালি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনাকালে নতুন প্রায় ২০ লাখ মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট খোলা হয়েছে। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং এর প্রয়োজনীয়তা এবং জনপ্রিয়তা দুটোই বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় হাজার কোটি টাকার বেশি। আগামীতে এর চাহিদা ও এ সংক্রান্ত ব্যবসা যে বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবসা ও সেবায় আসবে নতুন মডেল। গ্রাহক ব্যাংকে না গিয়েই সব ধরনের লেনদেন করতে পারবে এমন ব্যবস্থাই করা হবে আগামীতে।

করোনা আমাদের শিখিয়ে দিলো অফিসে না গিয়ে বাসায় বসে কিভাবে কাজ করা যায়। সামাজিকভাবে একত্র না হয়েও বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে ঘরে বসেই কিভাবে আড্ডায় কিংবা মিটিং এ যোগ দেয়া যায়। বিভিন্ন সভা, সমিতি, সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে অ্যাপসের ব্যবহার বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে জুম অ্যাপস। যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল এই এক সপ্তাহে অ্যাপসটি ৩২ লাখ ডাউনলোড হয়েছে। এছাড়া হাউজ পার্টি ১১ লাখ, গুগল ক্লাসরুম ১১ লাখ, সেভ দ্যা গার্ল ৮ লাখের মত। এই ডিজিটাল সেবাগুলোর ব্যবহার আগামীতে বাড়বে। এই বৃদ্ধি নতুন করে এসব খাতের ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে।

করোনা আমাদের শিখিয়েছে বেশি বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার কথা। করোনাকালে বিশ্ববাসীর পরিষ্কারের যে অভ্যাস তৈরি হলো, তা বন্ধ হবে না। বরং করোনা পুরোপুরি নির্মুল করা যাবে না, বিশেষজ্ঞদের এমন বক্তব্যের পর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনা অব্যাহত থাকবে। ফলে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়বে। হ্যান্ড সেনিটাইজার, হ্যান্ড ওয়াশ থেকে শুরু করে পিপিই এর চাহিদা কমবে বলে মনে হয় না।

অন্যদিকে বিশ্ব জুড়েই দেশগুলোর স্বাস্থ্যখাতের নাজুক পরিস্থিতি সবার কাছে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। অনেক দেশকেই স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠন করতে হবে। তাই এই খাতেও আগামী দিনে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা আরো বাড়বে। এভাবেই করোনা পরবর্তী বিশে^ নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। স্বপ্নবাজ, সময়ের সাথে এগিয়ে চলা উদ্যোক্তাদের হাতছানি দিচ্ছে এসব নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ। অবশ্য এক্ষেত্রে ছোট পুঁজি নয় বড় পুঁজির উদ্যোক্তাদেরই স্বপ্ন পূরণ হবে।

লেখক: ফরহাদ হোসেন, সদস্য, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নিবন্ধ অনুসারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.