বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রচলিত বাজেটীয় ব্যবস্থা থেকে সরে এসে তিন বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার আলোকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মধ্যমেয়াদি বাজেটীয় কাঠামোয় মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ে নতুন ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান সংকোচন রোধে কর্মসংস্থান ধরে রাখা ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিই নতুন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে। পাশাপাশি বাজারে নগদ অর্থপ্রবাহ নিশ্চয়তার জন্য সক্রিয় মুদ্রানীতি লাগবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মুদ্রানীতিকে স্থিতিশীলকরণ ও উন্নয়নমুখী—দুটো দায়িত্বই পালন করতে হবে।

লক্ষ্য ও খাতভিত্তিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এটা করতে পারলে চলমান কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য ও বিভাজন দূর হতে পারে। জনদ্রব্য প্রদানের রাষ্ট্রের দায়িত্বকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া, কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি হলেও দারিদ্র্য কমার হার কমে যাওয়া এবং পিছিয়ে পড়া, কর্মক্ষম, কর্মহীন ও কর্মে নিয়োজিত দরিদ্র নাগরিকদের ন্যূনতম শোভন জীবনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাহীনতা দূর না করতে পারলে অর্থনীতির সংকোচন থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে না। আরেকটি বহিঃস্থ ধাক্কা বা শক এলে স্থায়ী অভিযোজন ব্যবস্থাদি না থাকলে মানুষ আবার দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে নিপতিত হবে।

কৃষি-শিল্প উৎপাদনের এককেন্দ্রিকতা, উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় জোর না দিয়ে ভর্তুকির দিকে ঝুঁকে থাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের আনুকূল্যের অভাব এবং পুঁজিবাজার, ব্যাংক, বীমা, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি খাতে এবং নীতি সহায়তায় গোষ্ঠীতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় থাকায় উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রকৃত উদ্যোক্তাকে আস্থা দিচ্ছে না এবং আকৃষ্টও করছে না। ফলে জিডিপিতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের হার স্থবির হয়ে আছে।

আয়, সম্পদ, নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে ক্রমধাবমান বৈষম্যের লাগাম না ধরতে পারলে সামাজিক ভারসাম্য ধরে রাখা দুরূহ হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির দৌরাত্ম্য, প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর বিধ্বংসী আঘাত ও মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা থেকে রূপান্তরকারী উৎপাদন ব্যবস্থায় না হাঁটলে আগামী প্রজন্ম ছাড় দেবে না।

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রবর্তন, সর্বজনীন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গঠন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কারবারগুলো বিশাল প্রণোদনার দাবিদার।

মনে রাখা দরকার, করোনা-পূর্বকালেই ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কম ছিল। এ আর্থিক বছরের প্রথমার্ধের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্জন অনেক নিচে। ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। জানা আছে, যেকোনো সংকটের শুরুতে তারল্য প্রবাহ কমে যায়। অতএব, ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রফতানিকারী সরকারগুলোর সঙ্গে আমদানি ব্যয় পরিশোধের জন্য সময় বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোচনা করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিকারকদের অর্থ বিলম্বে পরিশোধের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতা দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আমদানি তহবিল গঠন করতে পারে। বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্নতা এড়াতে বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা অদলবদল বা কারেন্সি সোয়াপ, বারটার বব্যস্থা চালুর পদক্ষেপ নিতে পারে। পুঁজির বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে বা তারল্য জোগানের মাধ্যমে এ মহাসংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। সক্রিয় রাজস্ব নীতি লাগবে।

অর্থের জোগান আসবে কোত্থেকে
তিন বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হবে। অর্থায়নের প্রধান উৎস—কর, করবহির্ভূত রাজস্ব, অনুদান ও ঋণ। লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৃতীয় থেকে চতুর্থ প্রান্তিকে বেশ বড় ধরনের ব্যয় হয়—বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিসহ অন্য অনেক ব্যয়ই। আমদানি ও রফতানি দুটোই কমেছে। আমদানি শুল্ক কমে যাবে। অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় আয়কর ও মূল্য সংযোজন করও কমবে। সুতরাং রাজস্ব আয় কমে যাবে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার এরই মধ্যে টাকা নিয়েছে। ফলে সেখানে তারল্য সংকট আছে। এখন পর্যন্ত নিট বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে।

এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারকে অর্থসংস্থানের বিভিন্ন উৎস সমন্বয়ে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে, কিন্তু কৃচ্ছ্রতামুখী কৌশলে যাওয়া যাবে না। যেমন বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ব্যাপক ভর্তুকি বরাদ্দ বাদ দিতে হবে, সরকারের যে অতিরিক্ত জনবল প্রশাসনে আছে, তা এসডি হিসেবে হোক বা একই পদে বেশি লোক থাকা, এসব ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দৃশ্যমান ও চেষ্টা করলে কর আদায় করা যায় এমন খাতগুলো বের করতে হবে। যেমন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিবন্ধিত প্রচুর বিদেশী কাজ করছেন। সবচেয়ে সংরক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, এদের সংখ্যা আড়াই লাখ। এদের কাছ থেকেই প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার আয়কর আদায় সম্ভব। ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলকে সক্রিয় করে আদায় বাড়ানো যেতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পন্থায় কর পরিহার করে। এখানে দক্ষতার পরিচয় দিলে বেশ রাজস্ব আদায় সম্ভব। অনেক দেশীয় কোম্পানিকে গোষ্ঠীতান্ত্রিক কর সুবিধা আনুকূল্য দেয়া হয়। এগুলো পুনর্নিরীক্ষণ দরকার। তবে এক্ষেত্রে মানদণ্ড হবে কর্মসংস্থান; কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে কর সুবিধা পাবে। বর্তমানে বিচারাধীন করসংক্রান্ত মামলাগুলো সালিশির মাধ্যমে যৌক্তিক নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। তৃতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উৎস থেকে বৈদেশিক অনুদান বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করতে হবে। ঋণ মওকুফ, ঋণ অবলোপন ও ঋণ পরিশোধ স্থগিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে দেনদরবার বাড়াতে হবে। ঋণ-সুদ পরিশোধ বাবদ দায় কমাতে পারলে বাজেট বরাদ্দ অপেক্ষাকৃত কম লাগবে। সাম্প্রতিক বাজেটগুলোয় সুদাসল পরিশোধ বাজেটের এক নম্বর ব্যয় খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ঋণ-সুদ পরিশোধ বাবদ দায় কমানোর জন্য ঋণের সুদহার খুবই কম হতে হবে, ঋণ দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে এবং গ্রেস পিরিয়ড থাকতে হবে। বৈদেশিক উেসর ক্ষেত্রে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় সংস্থার দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ‘স্পেশাল ড্রইং রাইট’ আরো বেশি পরিমাণে ইস্যু, ঋণ পুনর্গঠনের, আইএমএফে বহুপক্ষীয় মুদ্রা অদলবদল বা কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থা স্থাপন ও আইএমএফের কোটা সংস্কারের পক্ষে মত দেয়া যেতে পারে। পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়া যাবে না। এরই মধ্যে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে আছে। ট্রেজারি বিল ও সঞ্চয়পত্রে ঋণ পরিশোধ ব্যয় বাড়াবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সরকারের অর্থের জোগান দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাধারণত ছয় মাস চালানোর মতো অতিরিক্ত তারল্য থাকার কথা। প্রয়োজন হলে নতুন অর্থ ছাপাতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে ওই পরিমাণ তারল্যই বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে, যে পরিমাণ অর্থ সংকোচন ক্ষতিকে পুষিয়ে দেবে বা মূল্যস্ফীতি সহনীয় অবস্থার মধ্যে রাখবে। অতএব, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সনাতন প্রথাগত ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাক্সে বন্দি না থেকে সৃজনশীলতা দেখাতে হবে।

মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতির জুজু
দুটো বিষয় পরিষ্কার করা যাক। বলা হয়, নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। বর্তমান মন্দায় ভোক্তা কর্তৃক ব্যয় ও উৎপাদনের যে দৈন্য, তাতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা নেই। মূল্যস্ফীতি তখনই ঘটে, যখন চলতি ব্যয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের প্রকৃত ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়। সুতরাং সংকুচিত অর্থনীতিতে অর্থ জোগানের বিকল্প নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ে চিন্তা না করে চাহিদা বাড়ানোর জন্য তারল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সুদহারও কমাতে হবে। নতুন অর্থের মুদ্রণ তখনই কার্যকর ভূমিকা পালন করবে যখন বেকারত্ব দূরীকরণ ইত্যাদির জন্য সরকারের নিজস্ব বিনিয়োগ বাড়বে। তবে একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ সহনীয় পর্যায় ছাড়িয়ে না যায়।

এ মুহূর্তে বাজেট ঘাটতি ও জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাতের দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময় নয়। বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সহনীয় ৩০ শতাংশের কোটায় আছে। যুক্তি দেখানো হয়, ঋণগ্রস্ত সরকারের পক্ষে জাতীয় অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা সবসময় ব্যর্থ হয়। তারা দাবি করেন, সরকারের ঋণ পরিশোধের জন্য ভবিষ্যতে করের পরিমাণ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত এ কর প্রদানের জন্য ভোক্তা তার ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার কমিয়ে অর্থ সঞ্চয় করার চেষ্টা করেন। এতে অর্থনীতির চালিকাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবে সবই ভবিষ্যতে অতিরিক্ত কর প্রদানের জন্য অর্থ সঞ্চয় করবে, এমনটি ঘটে না। সব ভোক্তার সঞ্চয় যথেষ্ট থাকে না বিধায় মন্দার সময় গড় পণ্যভোগের পরিমাণ কমে যায়। সঞ্চয়হীন মানুষ ও মন্দাক্রান্ত কারবারকে সরকারকেই অর্থ প্রদান করতে হয়। যেহেতু মন্দাকালীন বিনিয়োগ, ভোগব্যয় ও রফতানি কমে যায়, সরকারকে সামষ্টিক চাহিদা বাড়াতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হয়। সরকারি বিনিয়োগ বাড়ালে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বেড়ে যায়। বিনিয়োগ, ভোগব্যয়, সরকারি ব্যয় ও রফতানি-আমদানির নিটের সমষ্টিই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। মন্দাকালীন সরকার অতিরিক্ত ব্যয়ভার মেটাতে ঋণ গ্রহণ করলেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হলে সরকারের রাজস্ব বেড়ে যায়। পুনরুদ্ধারের পর ধাপে ধাপে সরকার নিজস্ব আয় থেকেই ঋণ পরিশোধ করে।

অগ্রাধিকার ও খাতওয়ারি বরাদ্দ
কভিড-১৯ রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিক পরিষেবাগুলো তথা স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের ব্যর্থতাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বাজেটীয় ঘাটতি লাগাম টানার তথাকথিত নীতির কারণে ব্যবহারিক মূল্যবৃদ্ধিকারী জনসেবা খাতগুলো অবহেলিত হয়েছে ও বরাদ্দ কমেছে। পুঁজি বা বিনিময় মূল্যবৃদ্ধিকারী খাত অগ্রাধিকার পেয়েছে। ‘বাজারই মূল চালিকাশক্তি’ এবং ‘সমাজ ও বাজার সমার্থক’—এ ধারণার প্রাধান্য থাকায় রাষ্ট্র সর্বজনকে জনদ্রব্য বা পাবলিক গুডস অথবা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদানের বাধ্যবাধকতা থেকে বিযুক্ত থেকেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ন্যায়সংগত একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই নীতি-কাঠামোর মৌল ভিত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেমন ব্যক্তি খাতের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে সর্বজনীন জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। প্রত্যেকের জন্য নথিভুক্ত ডাক্তার থাকতে হবে। বাংলাদেশে বিশালসংখ্যক মানুষ এখন আয়-রোজগারহীন, ক্ষুধার্ত ও নিরাপত্তাহীন। ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’ নামে কিছু কর্মসূচি আছে, কিন্তু তা খুবই অপ্রতুল, উপরন্তু দুর্নীতির শিকার। ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন অতীব জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত খাতগুলো কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের আগেই ঝুঁকির মুখে ছিল। কৃষি খাতে উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের মুনাফা কমে গেছে। নতুন প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য কোনো প্রয়োগ ও প্রভাব কৃষি ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা, পণ্য ও বাজারের বৈচিত্র্যের অভাব শিল্প খাতকে প্রধানত এক খাতনির্ভর করেছে। এ পোশাক শিল্প খাতেও রফতানি কমেছে। রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহ কমায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় দারিদ্র্য কমার হার কমেছে। প্রকৃত মজুরির বৃদ্ধি কমেছে। অর্থনৈতিক বৈষম্যও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। পুঁজি পাচার বেড়েছে। পুঁজিবাজারে মাঝে মাঝেই ধস নামছে।

রাষ্ট্রের অর্থ জনগণেরই অর্থ। জনগণের অর্থ কেবল গুণক প্রভাব তৈরিকারী খাতগুলোয় বরাদ্দ করতে হবে। জনগণের অর্থ যাতে মুষ্টিমেয়র হাতে না যায়, তা নিশ্চিত করা দরকার। প্রণোদনা কেবল প্রকৃত খাতগুলোকেই দেয়া প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জরুরি; কিন্তু কর্মসংস্থানই মূল নিয়ামক। লক্ষ্য বা মিশনভিত্তিক নীতিমালা নানা গুণক প্রভাব তৈরির সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ও পরবর্তীতে উন্নত দেশে পরিণত হতে আকাঙ্ক্ষী। উন্নয়নের পরবর্তী সোপানে যেতে রূপান্তরকারী উৎপাদন ব্যবস্থার প্রয়োজন। যেমন পরিবেশবান্ধব নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ের কল্যাণসাধনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় দূর করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.