পুরো বিশ্ব একসাথে এত বড় সংকটে এর আগে কখনো পড়েনি। কোন অঞ্চলে মহামারি হয়েছে, তো অন্য অঞ্চলে তার কোন প্রভাব পড়েনি। করোনাই প্রথম পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। স্থবির হয়ে গেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশ্বের বড় বড় দেশের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত। বিপর্যয় থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। অর্থনীতির চাকা থমকে যাওয়ায় কমে গেছে মানুষের আয়। বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। করোনায় করণীয় কী, এ নিয়ে ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) এর সাথে কথা বলেছেন, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।

তিনি বলেন, অতীতে এমন কোন মহামারি বিশ্ব দেখেনি। সারা বিশ্বে এমন ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেনি। স্প্যানিশ ফ্লু বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল। তবে তা সারা বিশ্বকে কাঁপাতে পারেনি। এই প্রথমবারের মত সারা পৃথিবীই আক্রান্ত হয়েছে। মানুষের জীবন পড়েছে শঙ্কায়। মহামারি আতঙ্কে দেশে দেশে লকডাউন চলছে। স্থবির হয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। মন্দার কবলে জড়িয়ে গেছে অর্থনীতিতে। তবে এই মন্দা মহামন্দায় রূপ নেয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।

খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, অর্থনীতিতে মন্দা বলতে আমরা বুঝি কিছু মানুষ কর্ম হারাবে। এক দুই বছর অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব পড়বে। এরপর সবাই ঘুরে দাঁড়াবে। তবে মহামন্দায় এই বিরূপ প্রভাব লম্বা সময়ের জন্য পড়ে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে চার পাঁচ বছর লেগে যায়। তাঁর দৃষ্টিতে, এবারে বিশ^ মহামন্দার দিকেই যাচ্ছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। বিশেষ করে রপ্তানি, আমদানি ও রেমিটেন্স বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব খাতে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে দেশ দীর্ঘ মেয়াদে সংকটের মধ্যে চলে যাবে।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয়ের ৭০ ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। করোনার আঘাতে সেখানকার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ঈদে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়লেও, আগামী বছর এর পরিমাণ অনেক কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। বাংলাদেশকে নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে হবে। সেই সাথে ঐসব বাজারে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে জাপানসহ পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ কাঙ্খিত গন্তব্য হতে পারে।

রপ্তানিতে পুনরায় গতি আনতে হবে। যেহেতু রপ্তানির প্রায় পুরোটাই তৈরি পোশাক। এ খাতের উদ্যোক্তাদের দক্ষতাও আছে। আশা করা যায় রপ্তানি পুনরুদ্ধার হতে খুব বেশি সময় লাগবে না, এমনটাই আশাবাদ খলীকুজ্জমানের। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা দীর্ঘায়িত হলে এ খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সেই প্রভাব মোকাবেলায় সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরী বলে তাঁর মত।

করোনায় সবচেয়ে কষ্টে আছে যারা দিন আনে দিন খায়। বিভিন্ন হিসাবে বলা হচ্ছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এখন ২০ শতাংশের হিসাবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হয় সাড়ে ৩ কোটির মত। নতুনদের হিসাব করলে এই সংখ্যা ৬ থেকে সাড়ে ৭ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এমন অনুমান তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এসব জনগোষ্ঠীর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।

এসব জনগোষ্ঠীকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নগদ সহায়তা করতে হবে। সরকার যে সহায়তা দিচ্ছে, তার পরিমাণ কম। এর পরিমাণ আরো বাড়ানো উচিত। ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কাজ করা বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, গ্রামেগঞ্জে অতিক্ষুদ্র শিল্প আছে, যাদের সংখ্যা এক কোটির বেশি হবে। এদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা চলতি মূলধন প্রয়োজন। এই অর্থ তাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কিভাবে পৌঁছানো হবে, তা সরকারই নির্ধারণ করবে। তবে এই চলতি মূলধন পৌঁছাতে যত দেরী হবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তত সমস্যা বাড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীত হচ্ছে গ্রাম। সেখানে আবার ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন ড. কাজী খলীকুজ্জমান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য সরকার ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এটা ভালো উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব শিল্পের সংখ্যা ৭০ হাজারের মত হতে পারে। তবে দেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোটি খানেক অতিক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পের সাথে অন্তত ৩ কোটি মানুষের জীবনজীবিকা জড়িত। এগুলো এখন বন্ধ থাকায় এসব অতিক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা নতুন করে দারিদ্র সীমার নীচে চলে যাচ্ছে। এদের তুলে আনার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা অতিক্ষুদ্র শিল্পের জন্য দেয়া উচিত, এমন অভিমত খলীকুজ্জমানের। তিনি বলেন, তাদের হাতে টাকা পৌঁছানো নি:সন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং চ্যানেলে হয়তো এটা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহায়তা নেয়া যেতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমেও সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্থনীতি পুনরুদ্ধা করতে যে টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন এটা খুবই উপযোগী। এই সহায়তার পরিমাণ জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশের মত উল্লেখ করে বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্যাকেজ থেকে যেন সব পক্ষ সঠিকভাবে সুবিধা নিতে পারে সেটি নিশ্চিত করা জরুরী। এই প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাজেটে জোর দেয়ার পরামর্শ তার। ভঙ্গুর স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এরপর শিক্ষা ও কৃষিতে গুরুত্ব দিতে হবে। আর পরিবহনখাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

খলীকুজ্জমান বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান ভীত কৃষি। এবারে কৃষিতে একটু বেশি নজর দেয়অর সময় এসেছে। কারণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে। যেসব দেশ খাদ্যশস্য রপ্তানি করতো করোনায় তারা ক্ষতিগ্রস্থ। চাইলেও ঐসব দেশ থেকে এখন আমদানি করা যাবে না। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যেন কোন জমি খালি না থাকে। আমাদের উচিত হবে, তার পরামর্শ মেনে জমি পতিত না রাখা। নিজস্ব আঙ্গিনা থেকে শুরু করে সব ধরনের জমিতে চাষ করার চেষ্টা করতে হবে। আশার খবর হচ্ছে, বোরোতে বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন নজর দিতে হবে আউশ ও আমনের দিকে। উৎপাদিত ধানের ৫৬ ভাগ আসে বোরো থেকে, আমন থেকে ৩৮ ভাগের মত। আর আউশ চাহিদার ৬ ভাগের মত মিটিয়ে থাকে।

খলীকুজ্জমান বলেন, উৎপাদন বাড়াতে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন। বোরো ধান কাটার ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান যান্ত্রিকীকরণ করছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কৃষির বৈচিত্র্যকরণ, যান্ত্রিকীকরণ এবং ভালো বীজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এজন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র চাষীদের সহায়তা দিতে হবে। তাদের ঋণ না দিয়ে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ ঋণ অনেকের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বাড়তি বোঝা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

করোনার অভিঘাতে অনেকে বেকার হয়েছে। সামনে বেকারের সংখ্যা আরো বাড়বে। এমন আশঙ্কা করে অর্থনীতিবিদ খলীকুজ্জমান বলেন, আমাদের দেশে অনানুষ্ঠানিকখাতেই কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেশি। তাদের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে যারা শহরে ভাসমান অবস্থায় থেকে স্বল্প আয় করতো তাদের সহায়তা করতে হবে। তাদের জন্য ঘরে ফেরা কর্মসূচি আবারো চালু করা যায় কিনা দেখতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্য গৃহহীনদের জন্য ঘর করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। শহরের এসব ভাসমান মানুষদেরকে ঐ সহায়তার অধীনে নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.