করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্বে জীবন আগে না জীবিকা আগে। এমন প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। জীবন বাঁচাতে গেলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হয়। আর তাতে বাধাগ্রস্থ হয় জীবিকা। এর আগে বিশ^ কখনো এমন দ্বৈত সমস্যায় পড়েনি। বাংলাদেশও একই ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত। তরতর করে বেড়ে চলা প্রবৃদ্ধিকে হঠাৎ থামিয়ে দিয়েছে করোনা। অথচ গেল দেড় দশক এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুবিধাই পেয়ে আসছিল দেশের সব স্তরের মানুষ। বিশেষ করে দারিদ্র বিমোচনে এর ভূমিকা সারা বিশে^ই প্রশংসিত হয়েছে।

করোনায় সমাজ ও অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কে তিনি বলেন, জীবন ও জীবিকা, একটি আরেকটির সম্পূরক। সাধারণ দেখা যায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লে মাথাপিছু আয় বাড়ে। আয় বাড়লে মানুষ অনাহারে থাকে না। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়ে যায়। গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এর সাথে বেড়েছে মানুষের আয়ুষ্কাল। করোনা আক্রান্তের আগ পর্যন্ত ভারতের চেয়ে আমাদের গড় আয়ু বেশি ছিল। কোভিডের ফলে এই দুটোতে সংঘাত এসেছে।

এখন যে প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে, জীবন না জীবিকা কোনটা আগে? জীবন বাঁচাতে হলে জীবিকা প্রয়োজন। আবার জীবনই যদি না থাকে তাহলে জীবিকার ব্যবস্থা করে কী হবে? ব্যবসায়িক কর্মকা- অব্যাহত রাখা দরকার। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে দেখা গেছে, তৈরি পোশাক কারখানায় অনেক শ্রমিক সংক্রমিতও হচ্ছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই মৃত্যু ঘটছে। যেখানে জীবন ও জীবিকা সম্পূরক ছিল এখন সেটা সাংঘর্ষিক হয়ে গেছে। এটাই বাংলাদেশের সমানে বড় চ্যালেঞ্জ।

করোনার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকা- কমে যাওয়ায় অনেক মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে চলে যাচ্ছে। যারা দারিদ্র সীমার নীচে ছিল, তারা আরো নীচের দিকে যাচ্ছে। এদের সহায়তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, সাহায্য বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুপ্রবেশ। আমরা দেখেছি নগদ সহায়তার ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়েছে। আবার চাল বিতরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির প্রমান মিলছে। ৬৭ জনের মত স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে যাতে দুর্নীতি ঢুকে না পড়ে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে হবে। আরো বেশি স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হবে। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আইসিইউ’র অভাবে যেন কারো মৃত্যু না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) যথেষ্ট পরিমাণে থাকতে হবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যখাতে যেসব প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রয়োজন তার সরবরাহ বাড়াতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে কোন ধরনের শিথিলতা অন্তত আসছে বাজেটে মেনে নেয়া যাবে না।

যদিও আসছে বাজেটের জন্য যে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি’র (এডিপি) অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সেখানে খাতভিত্তিক সর্বচ্চো বরাদ্দের তালিকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ আছে ৭ নম্বরে। এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৩ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৬.৩৫ শতাংশ। সরকারে মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ব্যয়ের সক্ষমতা না থাকায় বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না। সক্ষমতা নাই বলে বরাদ্দ বাড়ানোর যাবে না, এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। এই ধরনের কথা বলা যাবে না। বরং যে সব ক্ষেত্রে বরাদ্দ দিলে স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বাড়বে সেখানে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। অর্থাৎ বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।

এ বছর বাজেট ঘাটতি নিয়ে বেশি চিন্তা করা যাবে না। ঘাটতির মাত্রা একটু বাড়লে সমস্যা নেই। আমি মনে করি, এই অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ জিডিপি’র ৭ শতাংশ হলেও কোন সমস্যা হবে না। ঘাটতি মেটাতে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে চাইলেও এবারে তা সম্ভব হবে না। কারণ ব্যাংকগুলো এমনিতেই তারল্য সংকটে আছে। অন্যদিকে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ ব্যাংক নির্ভর। এই পরিস্থিতিতে সরকার বেশি ঋণ নেয়ার চেষ্টা করলে করোনা পরবর্তী বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ প্রাপ্তি কমে যাবে।

এই পর্যায়ে সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ নিতে হবে। এটি সম্ভব হবে টাকা ছাপানোর মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ব্যালেন্স শিট বাড়িয়ে দেখাবে। দেশের সংকটকালে এমন ব্যবস্থায় কোন সমস্যা তৈরি হবে না। বরং এটাই প্রয়োজন। এর পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক সাহায্যের নির্ভরতা বাড়াতে হবে। ইতিমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ^ ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য করোনায় বিপর্যস্ত হওয়ায় রপ্তানি ও রেমিটেন্স এর ক্ষেত্রে খুব একটা উন্নতি বলে হবে না। তবে সরকারকে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উপর গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষিকে এবারে অনেক গুরুত্ব দিতে হবে। জিডিপিতে কৃষির অংশগ্রহণ কমে গেলেও মোট শ্রমজীবীর ৪০ ভাগ এখনো এই খাতে নিয়োজিত। তাই কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে উৎপাদন বাড়ে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় কথা হলো জীবনকে সুরক্ষা দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল করতে হবে। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশে যত মানুষ কাজ করে তাদের ৮৫ ভাগই হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। করোনার ফলে এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে। এদের বেশির ভাগেরই এখন কোন কাজ নেই। তাদের জন্যই অর্থনীতিকে সচল রাখা প্রয়োজন। তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়াতে হবে। গ্রামকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি এবারে শহরকেন্দ্রিক এই কর্মসূচি চালু করা ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

বিনিয়োগের জন্য অর্থ প্রাপ্তির অন্যতম বড় উৎস পুঁজিবাজার। তবে বর্তমান বাস্তবতায় পুঁজিবাজার নিয়ে আগ্রহী হওয়ার মত কোন কারণ নেই। একেতো মানুষের আয় কমে গেছে, অন্যদেিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাতেও বাড়তি বিনিয়োগ করার মত তারল্য নেই। এছাড়া চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন কোন আইপিও বাজারে আসবে বলে মনে হয় না। তবে যেসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অর্থ বাজারে আটকে আছে, শেয়ার বিক্রি করে তা তুলে নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে পুঁজিবাজারে লেনদেনের সুযোগ দেয়া উচিত।
অনুলিখন: ফরহাদ হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.